উপদেষ্টা সম্পাদক ডেইলি এশিয়া প্রফেসর ড. এলহাম হোসেন । | ছবি: ডেইলি এশিয়া
ফিলিস্তিনি কবি মৌরিদ বার্গোতির কথা দিয়ে আলোচনা শুরু করা যা’ক। তাঁর মতে, “কবিতা কোন সিভিল সার্ভেন্ট নয় বা সরকারের চাকুরি করে না; কবিতা কোন সৈনিক নয়; কবিতা কারোই তাবেদারী করে না।” তাহলে কবিতা কার কী? প্রশ্নটি স্বভাবতই এসে যায়। এর উত্তর হলো কবিতা আসলে সর্বমানবের কন্ঠস্বর, নির্যাতিতদের প্রতিবাদের ভাষা, বঞ্চিতদের অধিকার আদায়ের স্লোগান। কবিতার শরীর থেকে বেরোয় অন্যায়, নিপীড়ন ও শোষণের বিরুদ্ধ-প্রপঞ্চের ঝাঁঝাঁলো গন্ধ। কবিতা কায়েমী স্বার্থবাদীদের ঘুমপাড়ানি গান শোনায় না। কবিতা মানুষের চেতনাকে জাগ্রত রাখে অতন্দ্র প্রহরী হয়ে, আর অন্যায়কারীর পীঠে আঘাত করে নির্মম চাবুক হয়ে। কখনও এটি হয়ে ওঠে জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতির সমৃদ্ধ বয়ান। কখনও আবার নন্দনের আধার। তাই মানুষকে বার বার কবিতার কাছেই যেতে হয়, আর কবিতাও পরম মমতায় মানুষেরই পরমাত্মীয় হয়ে ওঠে। যে কথা মুখ থেকে আসে সেটি প্রবেশ করে কানে, আর যে কথা অন্তর থেকে আসে সেটি প্রবেশ করে অন্তরে। কবিতার কথা আসে অন্তর থেকে, তাই এটি মানুষের অন্তরেই প্রবেশ করে। আর অন্তরের কোন সীমারেখা নেই। কোন দেশ নেই, কোন জাত নেই। মানুষের অন্তর সর্বজনীন, অনন্ত। কবিতাও সর্বজনীন, অনন্ত, আন্তর্জাতিক। তাই তো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেন, সব ঠাঁই মোর ঘর আছে, আমি সেই ঘর মরি খুঁজিয়া; দেশে দেশে মোর দেশ আছে, আমি সেই দেশ লব খুঁজিয়া। কবিতা প্রাচ্য বোঝে না, প্রতীচ্য বোঝে না, এই দু’য়ের মধ্যে বিভাজন বোঝে না। কবিতা বোঝে এই দু’য়ের মধ্যকার মহামিলন। কবিতা কারোও মুখের উপর দরজা বন্ধ করে না, বরং সবার পানে উদারতার দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়। তাই তো কবিগুরু আবারও বলেন, পশ্চিমে আজি খুলিয়াছে দ্বার, সেথা হতে সবে আনে উপহার দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে যাবে না ফিরে, এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে। এমন বিশ্বজনীনতার, উদারতার আহ্বান তো কবিতাই জানাতে পারে, আর কবিতার মাধুর্যই পারে এমন অমোঘ বাণীর অমিয় সুধা দেশ, কাল, জাতি নির্বিশেষে সব মানব সন্তানকে পান করাতে। কবিতাই পারে ধর্মে ধর্মে, জাতিতে জাতিতে বিভাজনের ভেদরেখাকে বিলীন করে দিতে। কবির কাছে মানুষই সবার উপর সত্য, মানব ধর্মই সবচেয়ে বড় ধর্ম। মানুষে মানুষে, হিন্দু-মুসলমানে কবি কখনও ভেদাভেদ করেন না, কারণ সবাই তো একই মায়ের সন্তান। তাই তো কাজী নজরুল ইসলাম উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেন, হিন্দু না ওরা মুসলিম? ঐ জিজ্ঞাসে কোন জন? কান্ডারী বল ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মার। মানুষের সংকটে কবি মানুষের কান্ডারী হয়ে আবির্ভূত হন। তিনি সাম্প্রদায়িকতার চোরাগলিতে হাঁটেন না। তিনি চলেন সাম্য, সুন্দর আর সংহতির পথ ধরে। কবিতার পথ চলা মানুষের সাথেই। কবিতা কখনই মানুষকে পেছনে ফেলে আগে চলেনি, আবার কখনই মানুষকে সামনে অনিশ্চয়তার পথে ঠেলে দিয়ে পেছনে পড়েনি। কবিতা চলেছে সবসময় মানুষের সাথে। ফলে মানুষের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতির সঙ্গে কবিতা তৈরী করেছে দ্বিরালাপ বা ইন্টারটেক্সচুয়ালিটি। কবিতা মানুষকে দর্শন, নন্দন, সমাজতত্ত্ব, ধর্মতত্ত্ব ও এমনকি অর্থশাস্ত্র সম্বন্ধেও দিকনির্দেশনা দিয়েছে। কবিতা মানুষের জীবনের সম্ভাব্য সব উপষঙ্গের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া ঘটিয়ে ঘটিয়ে হয়ে উঠছে ভাবনার আঁকড়। রামায়ণ- এর রাম আজ থেকে প্রায় তিন হাজার বছর আগের উপমহাদেশের পিতৃতান্ত্রিক সমাজকাঠামোর প্রতিভূ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। রামের সঙ্গে রাবনের যুদ্ধ তো চিরন্তণ ভালো আর মন্দের মধ্যকার দ্বন্দ্বকেই রূপকালাঙ্করিকভাবে উপস্থাপন করে। আজকের উত্তরাধুনিক যুগের ইকোফেমিনিজমের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করার জন্য অনেক বোদ্ধা-সমালোচক সীতার সঙ্গে ধরিত্রী (ভূমি) মাতার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেন। সীতা তো ধরিত্রিদেবীরই সন্তান। মহাভারত এর করুক্ষেত্রের যুদ্ধ যেন আমাদের জীবনেরই ন্যায় আর অন্যায়ের মধ্যকার অনবরত চলতে থাকা যুদ্ধেরই বহিঃপ্রকাশ। পঞ্চপান্ডবদের যুদ্ধে বিজিত মাল নিজেদের মধ্যে সমান করে ভাগ করে নেওয়ার প্রচেষ্টাকে এই ভারতবর্ষে প্রচলিত সহস্রাব্দ প্রাচীন সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থাকেই রূপকালঙ্কারিকভাবে উপস্থাপন করে। মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্য তো ক্ষমতাকাঠামোর কেন্দ্র আর পরিধির মধ্যকার বিভাজনকে অনেকটা ঘুচিয়ে দেয়। দেবী মনসা, যিনি থাকেন সাপ, ব্যাঙ, সরীসৃপের সঙ্গে, সেই মনসা দেবী পুজা লাভ করেন মানুষের কাছ থেকে। প্রতীকি অর্থে এভাবেই সাবলটার্নরা কবিতার ক্যানভাসে জায়গা করে নিয়েছে বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগে। এ কবিতা রাজনৈতিকভাবেও সাহায্য করছে মধ্যযুগের সমাজকাঠামোকে। ধনী-গরীবের ব্যবধান স্পষ্ট হওয়ায়, অর্থনৈতিক বৈষম্য বেড়ে যাওয়ায় এবং ক্ষমতাকাঠামোয় অংশগ্রহণ না থাকায় প্রান্তিকদের মধ্যে যে ক্ষোভ, অভিমান ও ক্রোধের জন্ম নিচ্ছিল, তা কিছুটা হলেও প্রশমিত হলো মঙ্গলকাব্য-এ এদের ঠাঁই দেওয়ার জন্য। ঊনবিংশ শতাব্দীতে এসে মাইকের মধুসুদন দত্ত তাঁর মেঘনাদ বধ মহাকাব্যের মধ্য দিয়ে প্রচলিত ডিসকোর্স বা প্রপঞ্চকে ডিকনস্ট্রাক্ট করে ফেললেন। যে ডিকনস্ট্রাকশনিজমকে বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে এসে ফরাসী দার্শনিক জাক দারিদা তাত্ত্বিকভাবে প্রতিষ্ঠা করলেন এবং যার অভিঘাতে কবিতার পঠন-পাঠন বদলে গেল, তা কিন্তু মধুসূদন ঊনবিংশ শতাব্দীতেই তাঁর মেঘনাদবধ মহাকাব্যের মধ্য দিয়ে দেখিয়েদিয়েছিলেন। সহস্র বছর ধরে যে রাবণ ছিল রাক্ষসদের রাজা, যে রাবণকে সহস্র বছর ধরে এই উপমহাদেশের মানুষ দেখেছে মানবিক গুণ বিবর্জিত, কামুক, লম্পট লংকারাজ হিসেবে, সেই রাবণের উপর তিনি সব মানবিক গুণ আরোপ করলেন। রাবণ হয়ে উঠলো রক্তমাংসে মানুষ। প্রচলিত প্রপঞ্চ ভেঙ্গে দিয়ে তার পুনঃনির্মাণ করলেন মধুসুদন। ১৮৬১ সালে মধুসূদন যখন মেঘনাদবধ মহাকাব্য রচনা করছেন তখন কিন্তু পশ্চিমা বিশ্বে শিল্পবিপ্লব ও পুঁজিবাদের অভিঘাতে কবিতার এষণ-ভূষণ প্রচণ্ডরূপে বদলাতে শুরু করেছে। যে কবিতাকে ইংরেজ রোমান্টিক কবি উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ ‘জোরালো আবেগের স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ’ বলে আখ্যায়িত করলেন, তাকে মাত্র তিন-চার দশকের মাথায় উল্টে দিলেন ভিক্টোরীয় যুগের কবি ম্যাথিউ আর্নল্ড। তিনি বললেন, কবিতা আসলে জীবনের সমালোচনা বা ঈৎরঃরপরংস ড়ভ খরভব. তিনি আরোও বললেন, তবে এই সমালোচনার সঙ্গে অবশ্যই ‘কাব্য সত্য’ ও ‘কাব্য সৌন্দর্য্যরে’ যোগ থাকতে হবে। জন মিল্টন সেই সপ্তদশ শতাব্দীতে বিশ্বাস করতেন যে, কবিদের জন্ম হয়, কেউ চাইলেই কবি হতে পারে না- সেই ধারণাকে ভেঙ্গেচূরে তছনছ করে দিয়ে টি.এস. এলিয়ট তাঁর ঞৎধফরঃরড়হ ধহফ ওহফরারফঁধষ ঞধষবহঃ (১৯১৯) প্রবন্ধে ঠিক প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরপরই ঘোষণা করলেন, কবিকে তাঁর ঐতিহ্য ও ইতিহাসের উত্তরাধিকার অবশ্যই বহন করতে হবে। তার সঙ্গে যোগ করতে হবে তার স্বতন্ত্র প্রজ্ঞা, সামর্থ্য ও মেধা। এ কাজ অত্যন্ত শ্রমসাধ্য। পড়াশুনা করতে হবে কবিকে। অর্থাৎ, এলিয়ট প্রচলিত ডিসকোর্স একেবাওে ইল্টে দিলেন। তাঁর উল্লিখিত প্রবন্ধে প্রতীয়মান হলো- কবির জন্ম হয় না, শ্রমসাধ্য কাজের মধ্য দিয়ে কবির সৃষ্টি হয়। এলিয়টের এই ধারণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বাংলাসাহিত্যে ১৯২০ ও ১৯৩০ এর দশকে একগুচ্ছ কবির আবির্ভাব ঘটে। এঁরা রবীন্দ্রধারার বাংলা কাব্যের খোলনোলচে পাল্টে দেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে মালার্মে, এমি লোয়েল, হিলডা ডুলিটল, এজরা পাউণ্ড, ডব্লিউ বি. ইয়েট্স-এর মধ্য দিয়ে যে সিম্বোলিসট ও ইমেজিস্ট আন্দোলন শুরু হয়, তার প্রভাবে আমাদের এখানেও কবিতার এষণ-ভূষণ বদলাতে থাকে। ফরাসী কবি বোদলেয়ার কবিতাকে নিয়ে যান আমাদের চিরাচরিত নগর জীবনের দৃষ্টির বাইরে থাকা কদার্য সব অলিগলিতে। কবিতার চিরায়ত নন্দনভাবনা প্রচণ্ড ঝাঁকুনি খায়, লন্ডভন্ড হয়ে যায়। গতানুগতিক ছন্দ সরে যেতে থাকে কবিতার জমিন থেকে। পরপর দু’টি বিশ্বযুদ্ধ মানুষের জীবনের যে প্রচন্ড অভিঘাত তৈরী করে, সিগমান্ড ফ্রয়েডের মনঃসমীক্ষণ মানুষের চেতন মনের উপর অবচেতনকে স্থাপন করে। কার্ল মার্কস এর কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো পুঁজিবাদের অ্যানাটমি করে। ফ্রেডেরিক নিৎসের নাস্তিবাদ মানুষের অহমিকার বেলুন ফুটো করে দেয়, পেইটিং বা চিত্রকর্মে সুরিয়েলিজম, ইম্প্রেশনিজম, এক্সপ্রেশনিজম, দাদাবাদ বা ডাডাইজম তোলপাড় তোলে। এতসব ভাংচুর যখন চলতে বিশ্বজুড়ে তখন কবিতা, যা মানুষের প্রতি, জীবনের প্রতি ও যাপনের পতি সংবেদনশীল, তা কিভাবে নির্লিপ্ত থাকতে পারে? স্বভাবতই বাংলা সাহিত্যের কবিতাও সুরে, স্বরে, রূপে, আকারে বদলাতে থাকে। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও এই পরিবর্তনে সাড়া না দিয়ে পারেনি। আধুনিকতাবাদের প্রতি তাঁর এক ধরনের নাকসিটকানো ভাব থাকলেও তিনি তাঁর কিছু লেখায় আধুনিকতার রসদ ব্যবহার করেছেন। তাঁর বাঁশি কবিতার হরিপদ কেরানী টি. এম. ইলিয়টের লাভ সং অব জে. আলফ্রেড প্রুফ্রকের কামতাড়িত বা লিবিডোতাড়িত ব্যর্থ প্রেমিকেরই হাহাকার ধ্বনিত করে। উদাহরণ হিসেবে এই কবিতার শেষ ক’টি ছত্র উদ্ধৃত করা যায় : এ গান যেখানে সত্য অনন্ত গোধূলি লগ্নে সেই খানে বহি চলে ধলেশ্বরী, তীরে তমালের ঘন ছায়া... আঙিনাতে যে আছে অপেক্ষা করে, তার পরনে ঢাকাই শাড়ি, কপালে সিঁদুর।। এ যেন এলিয়টের প্রুফ্রকেরই ব্যর্থ, শ্রান্ত অপ্রাপ্তির রসে সিক্ত দীর্ঘশ্বাস যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ মানুষকে অন্তর্মুখী করে তুললো, সেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলো ১৯৩৯ সালে। আর এই দুই বিশ্বযুদ্ধের মাঝখানের সময়ে বিশ্বকে তছনছ করে দিল অর্থনৈতিক মন্দা। লক্ষ লক্ষ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়লো। গৃহহীন হয়ে পড়লো। স্পেনে গৃহযুদ্ধ শুরু হলো। ভারতবর্ষে ইংরেজরা কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করে লক্ষ লক্ষ মানুষ হত্যা করলো। জার্মানীতে নাৎসী বাহিনী ইহুদি নিধনযজ্ঞ চালালো। যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় মেতে উঠে বিশ্ব খণ্ডিত হলো। মানুষ ভাগ হলো। এক মানুষের মধ্যে বহুধাবিভক্ত অসংখ্য মানুষের সৃষ্টি হলো। মানুষ নিজেই নিজের কাছে অচেনা হয়ে উঠলো। মানুষের হৃদয়, মানবতা, মানবিক বোধ স্বার্থপরতার সংকীর্ণ খোলসে আটকে গেল। শক্তি চট্টপাধ্যায়ের সেই “আনন্দ ভৈরবী” কবিতার মানুষ যে অসহায়ের মতো অনিশ্চয়তাতাড়িত হয়ে নিউরোসিস বা স্নায়ুবৈকল্যে আক্রান্ত হয়ে নিজেকে গুটিয়ে নেয়: সে কি জানিতো না এমনই দুঃসময় লাফ মেরে ধরে মোরগের লাল ঝুঁটি সে কি জানিতো না হৃদয়ের অপচয় কৃপণের বাম মুঠি সে কি জানিতো না যত বড় রাজধানী তত বিখ্যাত নয় এ হৃদয়পুর... পুঁজির প্রতাপে রাজধানী বড় হতে লাগলো কিন্তু মানবতা হেরে গেল এর দোর্দন্ড প্রতাপের কছে। এই মহাযুদ্ধ, মহাহত্যাযজ্ঞ চলল ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত। মানুষের সভ্যতা, অর্জন, ত্যাগ ইত্যাদি নিয়ে কতই না গর্ব ছিল! অথচ এই দুই বিশ্বযুদ্ধ সেই গর্বের বেলুন একেবারে ফুটো করে দিলো। ঔপনিবেশিক শোষণ, শাসন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ইতি টানতে শুরু করলো। ১৯৬০ সালের মধ্যে মেটামুটিভাবে সবগুলো উপনিবেশ স্বাধীনতা লাভ করলো। কিন্তু পরাজিত উপনিবেশিকরা হার মানার পাত্র নয়। তারা শোষণ-শাসন চালিয়ে যাওয়ার একটি পরোক্ষ কৌশল আবিষ্কার করলো। এটিকেই আমরা বলি সাম্রাজ্যবাদ। এই সাম্রাজ্যবাদের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হলো সংস্কৃতি। এডওয়ার্ড সাঈদ তাঁর ঈঁষঃঁৎব ধহফ ওসঢ়বৎরধষরংস গ্রন্থে এই বিষয়টি নিয়ে বিশদ আলোচনা হাজির করেছেন। ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত সাঈদের ঙৎরবহঃধষরংস সাহিত্য-পাঠের ধরণ-ধারণ পুরো বদলে দিলো। মানুষ দেখলো ঙৎরবহঃধষরংস প্রকাশের পূর্বে সাহিত্যের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ছিল এক রকম, আর এই গ্রন্থ প্রকাশের পর সাহিত্য পাঠের ধরণ হলো আরেক রকমের। সাহিত্য আর শুধুই নন্দনের ফ্রেমে আটকে থাকলো না। এটি নন্দনের পরিচ্ছদ হারিয়ে একেবারে নগ্ন-উলঙ্গ রূপে পাঠকের সামনে হাজির হলো। বোদ্ধা পাঠকরা দেখলেন কিভাবে ক্ষমতাকাঠামো সাহিত্য-শিল্পকে তার পক্ষে প্রপ্যাগান্ডা চালানোর অ্যাপারেটাস হিসেবে কবজায় রাখতে চায়। এমন চেতনার উদয় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাহিত্য, বিশেষ করে কবিতা ক্ষমতাকাঠামোর বিপরীতে দাঁড়িয়ে গেল। কবিতা হয়ে উঠলো প্রতিরোধ-বিদ্রোহ-বিপ্লবের ভাষা। কাজী নজরুল যেমন ঔপনিবেশিক ক্ষমতাকাঠামোর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন কবিতার ভাষায়, তেমনি বিংশ শতাব্দীতে দেশে দেশে কবিতা হয়ে উঠলা ঔপনিবেশিক শক্তি, সাম্রাজ্যবাদ, নয়া-উপনিবেশিবাদ ও স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা অকুতোভয় এক বিশাল কণ্ঠস্বর। এখন আর কবিতা আমাদের সুমেরীয় মহাকাব্য গিলগামেসের মতো কল্পনার জগতে অমরত্বের সুধার অনুসন্ধানে আহ্বান করে না, বরং মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে অমরত্ব অর্জনে উদ্বুদ্ধ করে, যেমন করে ফিলিস্তিনী কবি মাহমুদ দারবিশের কবিতা, লেবাননের কবি কাহলিল জিবরানের কবিতা, সিরিয়ার কবি অ্যাদোনিসের কবিতা, মার্টিনিকের কবি অ্যামে সিজেয়ারের কবিতা, বা নাইজেরিয়ার কবি গ্যাব্রিয়েল ওকারার কবিতা। বিংশ শতাব্দীতে এসে ক্ষুধার রাজ্যের গদ্যময় পৃথিবীতে কবিতা মানুষকে আর ঘুমপাড়ানি গান শুনালো না। শুনাতে পারলোও না। কবিতা নিয়ে গেল মানুষকে আধুনিক শ্রেণিবৈষম্যের কষাঘাতে জর্জরিত মানুষের কাছে, যারা কেন্দ্র নয়, প্রান্ত, যারা অপুষ্টি, অশিক্ষা, বঞ্চনার সঙ্গে ধস্তাধস্তি করে টিকে থাকে। এ পর্যায়ে ফরাসী কবি র্যাবোকে উদ্ধৃত করা বেশ প্রাসঙ্গিক বলে প্রতীয়মান হয়। তিনি বলেন, “আমি ভালোবাসি মরুভূমি, শুকিয়ে যাওয়া ফলের বাগিচা, বিবর্ণ ম্লান দোকান, ঠান্ডা হয়ে আসা পানীয়। নিজেকে টেনে নিয়ে যাবো পঁচা দুর্গন্ধের অলিগলি দিয়ে অন্ধ আঁখির কাছে, উৎসর্গ করবো সূর্যের চরণে, আগুনের যিনি দেবতা।” এই আগুনের দেবতার কাছেই যেতে চান কবিরা, কারণ, আগুন দরকার যেমন সব জঞ্জাল পুড়িয়ে ধ্বংস করতে তেমনি আবার সবকিছুকে পুড়িয়ে পরিশুদ্ধ করতে। এই অগ্নিপথে হেঁটেছেন স্পেনের বলিষ্ঠ কবি ফ্রেডেরিকো গার্সিয়া লোরকা-ও। শোষণ, বঞ্চনা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্য উচ্চারণে তিনি ছিলেন অকুতোভয় সৈনিক। এই সত্যের ঝাণ্ডা বইতে গিয়ে তাঁকে আততায়ীর হাতে প্রাণ দিতে হয়েছে। তাঁর শরীর ধ্বংস হয়েছে বটে, কিন্তু কবিতা এখনও বলকাচ্ছে প্রতিবাদ ও দ্রোহের শোণিতে। ফিলিস্তিনের সাহিত্যিক গাসান কানাফানি গৃহ হারানোর যাতনার কথা বলেছেন; শিকড়ে ফেরার অধিকারের কথা বলেছেন। তিনিও আততায়ীর হাতে খুন হয়েছেন। মৃত গাসান কানাফানি জীবীত কানাফানির চাইতেও অনেক অনেক শক্তিশালী। আর মৃত্যুভয় কখনও কবিকে সত্য উচ্চারণে বিরত রাখতে পারে না। কবি মানুষের গান গায়, মানবতার গান গায়। চিলির কবি পাবলো নেরুদা, যাকে একবার গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস বলেছিলেন বিশ শতকের যেকোন ভাষার সবচেয়ে বড় কবি, তিনিও কবিতায় কথা বলেছেন মানুষের, মানবতার। ২০১০ এর দশকে আরব বিশ্বে, বিশেষ করে তিউনিশিয়া, মিশর, লিবিয়া ও সিরিয়ায় যখন স্বৈরতন্ত্র ও অর্থনৈতিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে আন্দোলন অনুষ্ঠিত হলো তখনও কবিতা মধ্যপ্রাচ্যের মানুষের চিন্তা, চেতনা ও মনোভঙ্গির উপর প্রচন্ড অভিঘাত তৈরী করে। আরব সভ্যতার ঐতিহ্য, সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে আধুনিক আরবদের সামনে তুলে ধরতে যেসব কবি ব্যাপক ভূমিকা পালন করেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ইরাকের আব্দ আল ওয়াহ্হাব আল-বায়াতি (১৯২৬-১৯৯৯), মিশরের আহমাদ আব্দ আল মুতি হিজাজি (১৯৩), ফিলিস্তিনের কবি মাহমুদ দারবিশ (১৯৪১-২০০৮) এবং সিরিয়ার কবি যাকে আরবী ভাষার টি. এম. এলিয়ট বলা হয়, সেই অ্যাদোনিস (১৯৩০) প্রমুখ। এরা আরব বিশ্বে পুরাতনের জঞ্জাল সরিয়ে আধুনিকতা ও প্রাণোচ্ছ্বাসে উদ্বুদ্ধ জাতীয়তাবাদের প্রবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বর্তমান আরব বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমস্যা অনৈক্য। এই অনৈক্য দূর করার অন্যতম প্রধান উপষঙ্গ হলো ভাষা ও ঐতিহ্য। এই দু’য়ের উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠতে পারে আরব বিশ্বের জাতীয়তাবোধ ও জাতীয়তাবাদ। এই জায়গাতেই কাজ করছেন মধ্যপ্রাচ্যের কবিগণ। একই বিষয় পরিলক্ষিত হয় আফ্রিকার কাব্য সাহিত্য। বিশেষ করে উত্তর-ঊপনিবেশিক আফ্রিকায় রাজনৈতিক ব্যর্থতা, বারম্বার সামরিক অভ্যুত্থান, গণতন্ত্রের অপমৃত্যু, সাম্রাজ্যবাদী পশ্চিমা শক্তির অব্যাহত লুটপাট, স্থানীয় রাজনীতিকদের লাগামহীন দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির প্রতি প্রতিক্রিয়া দেখাতে আফ্রিকার কবিতা গর্জে ওঠে। চিনুয়া আচেবে (নাইজেরিয়া), ওলে সোয়িংকা (নাইজেরিয়া), গ্যাব্রিয়েল ওকারা (নাইজেরিয়া), ক্রিস্টোফার ওকিবো (নাইজেরিয়া), আমিনা সাঈদ আলী, মালেক হাদ্দাদ (আলজেরিয়া), ইবনে জয়দাল (মারাক্কো) প্রমুখ আফ্রিকার বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বরে পরিণত হয়েছেন। এরা যেমন আফ্রিকার অতীত ঐতিহ্য, লোকসাহিত্য, ওরেচার ও সংস্কৃতির ঐশ্বর্য আবিষ্কার করে আধুনিক বিশ্বের নজরে আনছেন, একই ভাবে ঔপনিবেশিক ও উত্তর ঔপনিবেশিক প্রপঞ্চের বিপরীতে প্রতি-প্রপঞ্চ নির্মাণ করে চলেছেন। বাংলাদেশেও আমাদের বর্তমান সময়ের কবিরাও একদিকে যেমন আমাদের জাতীয়তাবাদের বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছেন, অপরদিকে সমাজের নানান অসংগতিও তুলে আনছেন পাঠকের সামনে। তবে এ কাজ সহজ নয়। এর ঝুঁকি রয়েছে। তবে কবিরা ঝুকি নেন। ঝুঁকি নেওয়াই কবির স্বভাব। কবি সবসময় নিপীড়িতদের পক্ষে। নিপীড়কের পক্ষে থাকেন না। এটি আমাদের ঐতিহ্যের মধ্যেই রয়েছে। ১৯৭১ সালের পূর্বে আমাদের বাংলা সাহিত্যের কবিরা আমাদের মধ্যে দেশপ্রেম জাগ্রত করতে ও জাতীয়তাবাদী চেতনার উদ্রেক ঘটাতে কাজ করেছেন, বিপ্লব-সংগ্রামে উদ্দীপনা দিয়েছেন। স্বাধীনতার পর এবং বিশেষ করে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের পর সাম্প্রদায়িকতার উত্থানের বিরুদ্ধে কবিরা কলম ধরেছেন। স্বৈরশাসন, অপশাসনের বিরুদ্ধে কবিরা সবসময়ই অবস্থান নিয়েছেন। এটিই কবির কাজ, কবিতার কাজ। কবিরা হস্তিদন্ত নির্মিত অট্টালিকায় বসে জানালা দিয়ে জীবনকে দেখেন না। এরা আন্তোনিও গ্রামসির অর্গানিক বুদ্ধিজীবী। এরা মাঠে থাকেন, অট্টালিকায় নয়। এরা এক্টিভিস্ট, কর্মিষ্ঠ মানুষ। এরা মানুষের সাথে থাকেন, রক্তমাংসের মানুষের সাথে। এরা প্রমিথিউস। ক্ষমতাধর দেবরাজ জিউসের কাছ থেকে আগুন ছিনিয়ে এনে মানুষকে তা ব্যবহার করতে দেন, সভ্যতাকে এগিয়ে নেন। এরা জিউসের রক্তচক্ষুর ভয় পান না। ন্যায়কে ন্যায়, অন্যায়কে অন্যায় বলতে দ্বিধা করেন না। এরা হোমারের মহাকাব্য ইলিয়াড এর মহান বীর হেক্টরের মতো। এরা জানেন এদের পথ বন্ধুর, পঙ্কিল, ঝুঁকিপূর্ণ, কিন্তু এরা ছুটে চলে শুধুই সামনে। পশ্চাৎগমন এদের ধাঁতে নেই। এরা হাসান আজিজুল হকের ‘আগুন পাখি’। এরা আগুনে ঝাঁপ দেন, পুঁড়ে ছাই হয়ে যান। কিন্তু নিঃশ্বেষ হন না। সেই ছাই থেকেই অমর, অজর ফিনিক্স পাখির মতো এদের পুনর্জন্ম হয়। এরা কালকে অতিক্রম করে মহাকালের বিজয়মাল্য গলায় পরেন। পৃথিবীর সব কবির জয় হোক, কবিতার জয় হোক। লেখক: উপদেষ্টা সম্পাদক ডেইলি এশিয়া প্রফেসর ড. এলহাম হোসেন