সংবাদ শিরোনামঃ

আলুর বাম্পার ফলনে সর্বস্বান্ত চাষী

মো: তোফাজ্জল হোসেন, শেরপুর
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:
ছবি:

মাঠজুড়ে আলুর বাম্পার ফলন। কৃষকরা যখন মাটি খুঁড়ে লাল-সাদা গোল আলু তুলে আনছেন, তখন মনে হচ্ছে এ যেন এক প্রাচুর্যের উৎসব। কিন্তু এই প্রাচুর্যের আড়ালেই লুকিয়ে আছে কৃষকের বুকভরা দীর্ঘশ্বাস। মাঠভরা ফসল দেখে যে আশা বেঁধেছিলেন শেরপুরের কৃষকরা, তা এখন নিছক হতাশায় রূপ নিয়েছে। বাজারে এক কাপ চায়ের যা দাম, সেই দামেই বিক্রি হচ্ছে ৩ কেজি আলু। ফলে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ফলানো ফসলে লাভের মুখ তো দূরের কথা, উৎপাদন খরচ তোলাই এখন দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

উপজেলার কুসুম্বি ইউনিয়নের খিকিন্দা, কেল্লা, আমন, দক্ষিণ আমন, চণ্ডেশ্বর, উত্তর পেঁচুল, আকরামপুর এবং মির্জাপুর ইউনিয়নের মাখাইলচাপড় ও তালতাসহ গ্রামকে গ্রাম এখন আলুর সবুজ পাতায় ছেয়ে গেছে। মাঠের মধ্যে আলুর স্তূপ জমে আছে মাঠে। কিন্তু পাইকারি বাজারে ধস নামায় কৃষকের মাথায় হাত।  বর্তমান বাজারদর ও উৎপাদন খরচের হিসাব কষে দেখা যাচ্ছে, বিঘাপ্রতি কৃষকের লোকসান দাঁড়াচ্ছে প্রায় ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে শেরপুরে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ হাজার ৫০০ হেক্টর, যা ছাড়িয়ে আবাদ হয়েছে ২ হাজার ৭৮০ হেক্টর জমিতে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার যে আলু তোলা হয়েছে তাতে বিঘা প্রতি গড়ে ১২০ মণ ফলন হয়েছে। কিন্তু ফলন ভালো হলেও দাম বিপর্যয়ে কৃষকরা দিশেহারা।

জমিতেই বর্তমানে প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৬ থেকে ৮ টাকায়। অথচ এক কাপ দুধ চায়ের দামও ২০টাকা। কুসুম্বি ইউনিয়নের কৃষক ওমর ফারুক, সোলাইমান, আকবর, আব্দুস সামাদ আক্ষেপ করে বলেন, আজ দাম ৬-৭ টাকা। এক কাপ দুধ চায়ের দামে ৬ কেজি আলু বিক্রি করতে হচ্ছে। এত কষ্ট করে চাষ করে লাভ কী?

কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, কোম্পানি থেকে আলু বীজ, সারের সরকারি দর হলেও সিন্ডিকেট ও কৃত্রিম সংকটের কারণে কৃষকদের কিনতে হয়েছে বেশি দামে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে সেচ, কীটনাশক এবং শ্রমিকের চড়া মজুরি।

মির্জাপুর ইউনিয়নের জাহাঙ্গীর ইসলাম, আইয়ুব আলী নামের কৃষকদের দেওয়া তথ্যমতে, এক বিঘা জমিতে কীটনাশক, সেচ, শ্রমিক ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে ব্যয় দাঁড়ায় ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা। যারা জমি লিজ নিয়ে চাষ করেছেন, তাদের অতিরিক্ত গুনতে হয়েছে আরও ১৫-২০ হাজার টাকা। অর্থাৎ বিঘা প্রতি মোট খরচ প্রায় ৫৫-৬০ হাজার টাকা। অথচ বর্তমান দরে আলু বিক্রি করে ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা বিঘাপ্রতি। অর্ধেক টাকাও উঠে আসছে না।

কৃষক গোলাম, ইবাদতসহ কয়েকজন কৃষক বলেন, ছোট কৃষকরাই বেশি মরে। ২ থেকে ৫ বিঘা জমিতে আলু করেছি। এখন যে দাম, তাতে বিক্রি করলে অর্ধেক লস। আমাদের সংরক্ষণের সুযোগ কম, তার ওপর সিন্ডিকেটের কারসাজি তো আছেই।

গত বছর আলুতে বড় ধরনের লোকসান দিয়েছিলেন উপজেলার অনেক কৃষক। মির্জাপুর ইউনিয়নের মাথাইল চাপড় গ্রামের কৃষক জাহাঙ্গীর হোসেন গতবার ১৫০ বিঘা জমিতে চাষ করে ৪০ লাখ টাকা লোকসান দেন। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার আশায় এবারও তিনি বড় পরিসরে আবাদ করেছিলেন। কিন্তু এবারও একই পরিণতি।

কৃষকরা বলছেন, একদিকে প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা, আর অন্যদিকে ন্যায্য মূল্য না পাওয়া সব মিলিয়ে ঋণের বোঝা এখন গলার ফাঁস। বিঘাপ্রতি ২০ হাজার টাকার এই লোকসান শুধু একটি সংখ্যা নয়, বরং অসংখ্য পরিবারের স্বপ্ন ভঙ্গের গল্প। টুনিপাড়া গ্রামের কৃষক লিটন বলেন, দাম যাই হোক, জমি তো খালি করতে হবে। আলু তুলেই ধান লাগাতে হবে, তাই লস দিয়েই বিক্রি করছি। আলু সংরক্ষণে হিমাগারের ভাড়াও এবার বেড়েছে। গত বছর প্রতি বস্তা সংরক্ষণে ১৮০ টাকা লাগত, যা এবার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২০ টাকায়। পরিবহন খরচসহ যা প্রায় ৩০০ টাকার কাছাকাছি। শেরপুর ও ভবানিপুরের হিমাগারগুলোতে আলু সংরক্ষণ শুরু হলেও সাধারণ কৃষকদের অনেকেই অর্থাভাবে হিমাগারমুখী হতে পারছেন না।

এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফারজানা আকতার ও কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা জুলফিকার হায়দার জানান, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার আলুর বাম্পার ফলন হয়েছে। দাম না থাকায় ক্ষতিগ্রস্থ কৃষক। তবে মাঠ পর্যায়ের কৃষকদের দাবি, রপ্তানির আশ্বাসের চেয়ে জরুরি এখন বাজার নিয়ন্ত্রণ। সিন্ডিকেটের কারসাজি বন্ধ করে সরকার যদি এখনই ধানের মতো আলুরও ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ ও ক্রয়ের উদ্যোগ না নেয়, তবে আগামী মৌসুমে আলু চাষে আগ্রহ হারাবেন হাজারো কৃষক। তাদের একটাই কথা “কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে।”

বিষয়:

এলাকার খবর

সম্পর্কিত